
মানুষ, আমি এবং দৌড়
Nipu Sen
30 March 2026
আমার নিজের উপলব্দি দৌড় নিয়ে
যে সময় থেকে মানুষের খাদ্য, বস্ত্রের মতো মূল চাহিদা গুলো মিটে গিয়েছে, তার পর থেকেই মানুষ জানার চেষ্টা করে চলেছে, সে আসলে কে ? আমি কে ? কি আমার আসল পরিচয়? এই ধারায় যখন মানুষ আরও এগিয়ে গেলো, তখন জানতে পারলো, নিজেকে জানতে পারলেই সব জানা যায়, সব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় ! তাই মনীষী বললো, নিজেকে জানো ( সক্রেটিস )!
একদা মানুষ শিকার করে নিজের ক্ষুধা নিবৃত্ত করতো, সেখানে বেশ আদীম একটা ব্যাপার ছিলো, যে প্রাণিকে হত্যা করা হবে সে ছুটছে প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে আর মানুষ ছুটছে তার পেটে জ্বলতে থাকা ক্ষুধার আগুন নেভানোর জন্য, শুধু মাত্র নিজের জন্য না, কোথাও সে রেখে এসেছে তার শিশু আর নারীকে, শিকার করতে পারলেই জুটবে সবার জন্য খাবার, দিনের পর দিন তাড়া করার পর এক সময় পশু ক্লান্ত হবার পর, মানুষের ভাগ্যে খাবার জুটতো। প্রতিটা সফল শিকারী ছিলো, একজন সেরা দৌড়বিদ, আর এইভাবেই মানুষের সাথে একীভূত হয়েছে "দৌড়" ! এখানেই শেষ না, মানুষ - প্রকৃতি আর আরও ভিন্ন ভিন্ন ধরনের হুমকী থেকে জীবন বাঁচানোর জন্যও "দৌড়" ছিলো আশীর্বাদের মতো।
সময়ের বিবর্তনে মানুষ নিজের বুদ্ধিমত্ত্বা খাঁটিয়ে নিজের জীবন কিভাবে আরও সহজ করা যায় আর আরামদায়ক করা যায় সেটা বের করে ফেললো, আর সেই সাথে জীবিকার জন্য, জীবন বাঁচানোর জন্য যে দৌড় তা ধীরে ধীরে মানুষের জীবন থেকে হারিয়ে যেতে শুরু করলো - কিন্তু বিজ্ঞানের বিভিন্ন আশীর্বাদের সাথে সাথে অত্যাধিক সহজ আর আরামদায়ক জীবন মানুষের জীবনে বেশ কিছু শারীরিক আর মানসিক রোগ নিয়ে হাজির হলো, যা অভিশাপে পরিণত হয়েছে নতুন এই সমাজে।
শুরুতেই যেমন আমরা জেনেছিলাম, নিজের ভেতরেই সব প্রশ্নের উত্তর আছে, ঠিক তেমন ভাবেই, মানুষ তার নিজের মতো করেই জানতে পারলো দৌড় হতে পারে তার মুক্তির পথ, যখন আধুনিক মানুষ দৌড়ানো শুরু করলো, তারা অবাক হয়ে দেখলো তারা শারীরিক, মানসিক সব দিক দিয়ে ভালো বোধ করছে, সেই সাথে খেলা হিসেবেও এই দৌড় যুক্ত হলো মানুষের জীবনের সাথে, অনেকেই এটাকে বেছে নিলো বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে ।
বর্তমানে, দৌড়কে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে বিশাল এক সাম্রাজ্য/ বানিজ্যিক কার্যক্রম, এটাকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছে ব্যাবসায়ী আর দৌড়বিদরা মিলে, জুতা থেকে শুরু করে, মাথার টুপি! শহরের কঠিন রাস্তা থেকে শুরু করে পাহাড় পর্বতের, বন/ জঙ্গলের গভীরে সব জায়গায় দৌড়কে সহজ করে দেবার জন্য তৈরি হচ্ছে হাজার হাজার রকমের উপকরণ, একই সাথে কি কি খাবার কিভাবে খেলে ভালো দৌড়াতে পারবে মানুষ, সেটা নিয়েও হচ্ছে অনেক গবেষণা, আর হচ্ছে বাণিজ্য! পৃথিবীর ভিন্ন ভিন্ন প্রান্তে হচ্ছে ভিন্ন ভিন্ন ধরণের দৌড় প্রতিযোগিতা, মানুষ প্রতি সুযোগে ছাড়িয়ে যাচ্ছে নিজের আগের আমিকে, নতুন করে লিখছে ইতিহাস, যা আগে অসম্ভব মনে হতো মানুষ তা সম্ভব করে প্রমাণ করছে মানুষের সক্ষমতা অসীম !
মানুষ যখন দৌড়ানো শুরু করে প্রথমেই তার হৃদপিণ্ড খুবই তৎপর ভাবে রক্ত পৌঁছে দেয়ার জন্য কাজ শুরু করে আর সাহায্য করে মানুষের শরীরকে এগিয়ে নিয়ে যেতে, একই সাথে নিঃসরিত হয় ভালো লাগার ভিন্ন ভিন্ন হরমোন, যা দ্রবীভূত করে মানুষের সব ধরনের দুশ্চিন্তা, আর শুরু হয় এক ভালো লাগার অনুভূতি!! আধুনিক মানুষের কাছে দৌড়ের এই রূপটাই বহুল পরিচিত, সেই সাথে ইদানীং যোগ হয়েছে নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা, উদাহরণ হিসেবে দেয়া যেতে পারে, একজন সৌখিন দৌড়বিদ শখের ছলে নিজের প্রথম ম্যারাথন (৪২. ১৯৫ কিলোমিটার) দৌড়ে ছিলেন, ৫ ঘন্টায়, এর পরের চেষ্টায় উনি চান এর চেয়ে কম সময়ে এই দূরত্ব অতিক্রম করতে, এই আখাঙ্খা ক্রমেই বাড়তে থাকে, সেই অনু্যায়ী বদলে যেতে থাকে তার জীবন যাত্রা, দৌড় কেন্দ্রিক জীবন হয়ে যায় সেই মানুষের, যা তাকে ধীরে ধীরে একটা ছন্দবদ্ধ জীবনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়।
মুদ্রার ভিন্ন দিকের মতো, এখনো কিছু মানুষ আছে যাদের কাছে এখনো দৌড় আগের মতোই আছে, যেমন- ম্যাক্সিকোর রোরোমুড়ি "তরাহুমারা" নামে পরিচিত আদিবাসী জনগোষ্ঠী, যারা জন্ম থেকেই দৌড়বিদ, মাইলের পর মাইল তারা দৌড়ে যায় আনন্দের সাথে, সেখানে থাকে শুধু আনন্দ, এক যায়গা থেকে অন্য যায়গাতে যেতেও তারা এখনো নিজেদের পায়ের ওপর ভর করে উড়ে বেড়ায়, মাটির বুকে প্রজাপতির মতো!
ক্রিস্টোফার ম্যাগডুগাল নামের একজন আমেরিকান লেখক ও সাংবাদিক, শখের দৌড়বিদ "তরাহুমারা" আর আধুনিক সেরা দৌড়বিদদের নিয়ে আয়োজন করেন এক লম্বা দূরত্বের দৌড় প্রতিযোগিতা, উদ্দেশ্য - পরখ করে দেখা, কারা দৌড়ের দিক থেকে শ্রেষ্ট দৌড়বিদ, আধুনিক সুযোগ সুবিধা ভোগ করা দৌড়ের মানুষরা নাকি যারা জন্ম থেকেই দৌড়ে যাচ্ছে তারা ?
এই উত্তর পাওয়া যাবে ক্রিস্টোফারের বই, Born to Run এ ! এই উদাহরণের কারন হলো, দৌড়ের যে সৌন্দর্য আর কষ্টের মাধ্যমে শান্তি খুঁজে পাওয়া, তা অনেক সময় অনেক কারনে আড়ালে চলে যায়, মানুষ মুখ্য উদ্দেশ্যটাই ভুলে যায়, তাই যদি, আমি কে ? এই প্রশ্নের উত্তরের মতো যদি মানুষ প্রতি সময় খুঁজে চলে আমি কেন দৌড়াই? আমার দৌড়ানোর উদ্দেশ্য কি ? আমি দৌড়ের কাছ থেকে কি চাই? তবে দৌড় হতে পারে তার আত্ম উপলব্ধি আর আত্মমুক্তির পথ।
প্রায় ৮ বছর আগে আমি যে দৌড় শুরু করেছিলাম, তার যাত্রা এখনো বহমান আছে, সময়ের সাথে সাথে দৌড় আমাকে পরিণত মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে সাহায্য করেই চলেছে, একই সাথে ভালো কোন খাবার যেমন ভাগ করে খেলে আনন্দ বেশি পাওয়া যায় ঠিক তেমন ভাবেই নিজে একা না দৌড়ে যদি সবাইকে সাথে নিয়ে দৌড়ানো যায় তার আনন্দ অনেক বেশি, এই লক্ষ্য নিয়েই আমার নিরন্তর চিন্তা থাকে কিভাবে চারপাশের মানুষকে আর আমার নিজেকে উদ্দিপিত রাখা যায়!
নিজের দৌড়ের শুরু হয়েছিলো মানসিক চাপ থেকে নিজেকে মুক্ত করার জন্য, বাবার প্রথম ব্রেন স্ট্রোক হয় ২০১৬ সালে, আমি আর মা মিলে লড়ে যাচ্ছিলাম, সেই সাথে ছিলো চাকরী আর অনিশ্চয়তা থেকে মুক্তি পেতে আমি দৌড়কে বেছে নিয়েছিলাম পথ হিসেবে, আর যা পেয়েছি তা অনেক, এই বোধ অনেক বেশি শক্ত পোক্ত হয়েছে করনা মহামারী আর আমার মায়ের কিডনী বিকল হবার পর, যখনই আমি কোন দৌড়ের জন্য গিয়েছি, শুরুতে কঠিন লাগলেও ধীরে ধীরে সময় আর শরীর মানিয়ে নেয় আর উপভোগ করতে থাকি। দৌড় আমাকে সব সময় স্থির হয়ে কঠিন সময়ের সম্মুখীন হবার শিক্ষা দেয় একই সাথে নিজের শক্তি আর মরনশীলতা নিয়ে আমাকে সব সময় মাটির কাছাকাছি থাকতে সাহায্য করে।
দৌড়ের আরও ভালো দিকের মধ্যে অন্যতম হলো, এই খেলা আমাদের এক হবার শিক্ষা দেয়, আমাদের দেশে দৌড়ের পরিচয় আর ছড়িয়ে দেবার ক্ষেত্রে বিডি রানার্স অনেক বড় ভূমিকা পালন করেছে, তারাই দেখিয়েছে পথ, সেই দেখানো পথেই দেশের দৌড়বিদরা এগিয়ে যাচ্ছে। নিজেদের সমমনা দৌড়বিদদের নিয়ে আমাদের যে দল, টিম আগারগাঁও, আমাকে নিয়ত শিখিয়ে যাচ্ছে কিভাবে আমরা একটা দল হিসেবে নিজেদের অ্যাথলেটদের জন্য কাজ করতে পারি।
আমরা যারা শখের দৌড়বিদ, তাদের নিজেদের ভিন্ন ভিন্ন উদ্দেশ্য থাকে আর সেটা পূরনের জন্য, সঠিক উপায়ে নিজেকে তৈরি করা খুব জরুরী, এই যায়গায় আমাকে পথ দেখিয়েছে, AALPS, যার মূল মন্ত্রই ছিলো, We belive in training. ওয়ার্ম আপ, কুল ডাউন, ইজি রান, টেম্পো রান, স্ট্রেন্থ ট্রেইনিং, রানিং ড্রিলস, ব্রিদিং প্র্যাক্টিস সব কিছু মিলিয়ে দৌড় যে একটা ফুল লাইফ স্টাইল এটা আমাকে হাতে কলমে শিখিয়েছে AALPS, এর পেছনে ছিলেন তাহির ভাই, যার স্পিরিট সব সময় ছিলো, নিজেদের ম্যাক্সিমাম দিয়ে অ্যাথলেট তৈরি করা, আমার এই অবস্থানের পেছনে এই টিমের অবদান অসীম ।
এখন আমাদের দেশে অনেক দৌড়ের ইভেন্ট হয় আর এই ইভেন্ট গুলো কিছুটা উৎসবের মতো, সব রানারা নিজেদের মতো করে একত্রিত হয়ে দৌড়ায়, বেশ চোখের শান্তি- ইভেন্টগুলোতে আমি পেসিং বেশ উপভোগ করি, একজন পেসার দৌড়ায় তার নিজের টিমের দৌড়বিদদের জন্য আর এরা যখন সুস্থ ভাবে সঠিক সময়ে ফিনিশিং লাইন অতিক্রম করে, পেসার যে তৃপ্তি পায় তা অমূল্য, আমি আমার এই অনুভূতিটা বেশ উপভোগ করি- সবাই যেন দৌড়ের আসল সৌন্দর্য আর মজাটা পায়, সেই কারনে আমিও তাদের সাথে দৌড়ে যাই। পেসিং এর দলব্ধ দৌড়ের আনন্দ এক রকম আর একা একা দৌড়ের আনন্দ, কষ্ট ভিন্ন রকম, একেক সময়কার দৌড় আমাদের জীবন সম্পর্কে একেক রকম শিক্ষা দেয়, আরও নির্দিষ্ট করে বললে, দৌড়ের কষ্ট আমাদের জীবন যাপনের কষ্টকে সহজ করে আর সব ধরনের পরীক্ষায় ধৈর্যের সাথে মননিবেশ করতে উৎসাহ দেয়।
সাসটেইনেবল বা টেকসই দৌড় বলতে আমি বুঝি সুস্থ থেকে নিজের আয়ুস্কাল পর্যন্ত দৌড়ে যেতে পারার ক্ষমতা, আমার ক্ষেত্রে বলতে গেলে আমি আমার বার্ধক্য কাল পর্যন্ত দৌড়াতে চাই, নিজের সাথে সবার সাথে, সুস্থ ভাবে যদি তখনও যে কোন দূরত্ব দৌড়ে অতিক্রম করতে পারি তবে আর তেমন কিছু বাকি থাকবে না পাওয়ার, সুস্থতার চেয়ে বড় আশীর্বাদ আর হয়না আর দৌড় আমাদের এই জীবন দর্শনে অভ্যস্থ হতে সাহায্য করে।
দৌড়ের গল্প অনেক পুরনো আর বিশাল, সবাই যেন এই বিশালতা আর মুক্তির স্বাদ পায় একই সাথে - যেন দৌড়কে ভালবাসে আর দৌড়কে নিজের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ করে নেয়, এই চাওয়াই থাকবে ।
Karma Rating
5.0 / 5 · 3 ratingsLog in to give Karma Points.
This content has contributed 15 Karma Points to its author.
Comments (2)
দুর্দান্ত লেখা ভাই, অনেক ভালো লাগলো, আশা করি সামনে আরো লেখা পাবো
Boss is here!